Friday, May 31, 2019

সম্পাদকীয়-র পরিবর্তে







"সজারুটা ভয়ানক কাঁদতে লাগল, “হায়, হায়! আমার পয়সাগুলো সব জলে গেল! কোথাকার এক আহাম্মক উকিল, দলিল খুঁজে পায় না!
নেড়াটা এতক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে ছিল, সে হঠাৎ বলে উঠল, “কোনটা শুনতে চাও? সেই যেবাদুড় বলে ওরে ও ভাই সজারুসেইটে?”
সজারু ব্যস্ত হয়ে বলল, “হ্যাঁ-হ্যাঁ, সেইটে, সেইটে।
অমনি শেয়াল আবার তেড়ে উঠল, “বাদুড় কি বলে? হুজুর, তা হলে বাদুড়গোপালকে সাক্ষী মানতে আজ্ঞা হোক।
কোলাব্যাঙ গাল-গলা ফুলিয়ে হেঁকে বলল, “বাদুড়গোপাল হাজির?”
সবাই এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কোথাও বাদুড় নেই। তখন শেয়াল বলল, “তা হলে হুজুর, ওদের সক্কলের ফাঁসির হুকুম হোক।
কুমির বলল, “তা কেন? এখন আমরা আপিল করব?”
প্যাঁচা চোখ বুজে বলল, “আপিল চলুক! সাক্ষী আন।
কুমির এদিক-ওদিক তাকিয়ে হিজি বিজ্ বিজ্‌কে জিজ্ঞাসা করল, “সাক্ষী দিবি? চার আনা পয়সা পাবি।পয়সার নামে হিজি বিজ্ বিজ্ তড়াক্ করে সাক্ষী দিতে উঠেই ফ্যাক্‌ফ্যাক্ করে হেসে ফেলল।
শেয়াল বলল, “হাসছ কেন?”
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “একজনকে শিখিয়ে দিয়েছিল, তুই সাক্ষী দিবি যে, বইটার সবুজ রঙের মলাট, কানের কাছে নীল চামড়া আর মাথার উপর লালকালির ছাপ। উকিল যেই তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, তুমি আসামীকে চেন? অমনি সে বলে উঠেছে, আজ্ঞে হ্যাঁ, সবুজ রঙের মলাট, কানের কাছে নীল চামড়া, মাথার উপর লালকালির ছাপহোঃ হোঃ হোঃ হো—”
শেয়াল জিজ্ঞাসা করল, “তুমি সজারুকে চেন?”
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “হ্যাঁ, সজারু চিনি, কুমির চিনি, সব চিনি। সজারু গর্তে থাকে, তার গায়ে লম্বা-লম্বা কাঁটা, আর কুমিরের গায়ে চাকা-চাকা ঢিপির মতো, তারা ছাগল-টাগল ধরে খায়।বলতেই ব্যাকরণ শিং ব্যা-ব্যা করে ভয়ানক কেঁদে উঠল।
আমি বললাম, “আবার কি হল?”
ছাগল বলল, “আমার সেজোমামার আধখানা কুমিরে খেয়েছিল, তাই বাকি আধখানা মরে গেল।
আমি বললাম, “গেল তো গেল, আপদ গেল। তুমি এখন চুপ কর।
শেয়াল জিজ্ঞাসা করল, “তুমি মোকদ্দমার কিছূ জানো?”
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “তা আর জানি নে? একজন নালিশ করে তার একজন উকিল থাকে, আর একজনকে আসাম থেকে ধরে নিয়ে আসে, তাকে বলে আসামী। তারও একজন উকিল থাকে। এক-একদিকে দশজন করে সাক্ষী থাকে! আর একজন জজ থাকে, সে বসে-বসে ঘুমোয়।
প্যাঁচা বলল, “কক্ষনো আমি ঘুমোচ্ছি না, আমার চোখে ব্যারাম আছে তাই চোখ বুজে আছি।
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “আরো অনেক জজ দেখেছি, তাদের সক্কলেরই চোখে ব্যারাম।বলেই সে ফ্যাক্‌ফ্যাক্ করে ভয়ানক হাসতে লাগল।
শেয়াল বলল, “আবার কি হল?”
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল অবিমৃষ্যকারিতা, তার ছাতার নাম ছিল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষুকিন্তু যেই তার বাড়ির নাম দিয়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে। হোঃ হোঃ হোঃ হো—”
শেয়াল বলল, “বটে? তোমার নাম কি শুনি?”
সে বলল, “এখন আমার নাম হিজি বিজ্ বিজ্।
শেয়াল বলল, “নমের আবার এখন আর তখন কি?”
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “তাও জানো না? সকালে আমার নাম থাকে আলুনারকোল আবার আর একটু বিকেল হলেই আমার নাম হয়ে যাবে রামতাড়ু।
শেয়াল বলল, “নিবাস কোথায়?”
হিজি বিজ্ বিজ্ বলল, “কার কথা বলছ? শ্রীনিবাস? শ্রীনিবাস দেশে চলে গিয়েছে।অমনি ভিড়ের মধ্যে থেকে উধো আর বুধো একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “তা হলে শ্রীনিবাস নিশ্চয়ই মরে গিযেছে!
উধো বলল, “দেশে গেলেই লোকেরা সব হুস্‌হুস্ করে করে মরে যায়।
বুধো বলল, “হাবুলের কাকা যেই দেশে গেল অমনি শুনি সে মরে গিয়েছে।
শেয়াল বলল, “আঃ, সবাই মিলে কথা বোলো না, ভারি গোলমাল হয়।
শুনে উধো বুধোকে বলল, “ফের সবাই মিলে কথা বলবি তো তোকে মারতে মারতে সাবাড় করে ফেলব।বুধো বলল, “আবার যদি গোলমাল করিস তা হলে তোকে ধরে এক্কেবারে পোঁটলা-পেটা করে দেব।
শেয়াল বলল, “হুজুর, এরা সব পাগল আর আহাম্মক, এদের সাক্ষীর কোনো মূল্য নেই।
শুনে কুমির রেগে ল্যাজ আছড়িয়ে বলল, “কে বলল মূল্য নেই? দস্তুরমতো চার আনা পয়সা খরচ করে সাক্ষী দেওয়ানো হচ্ছে।বলেই সে তক্ষুনি ঠক্‌ঠক্ করে ষোলোটা পয়সা গুণে হিজি বিজ্ বিজের হাতে দিয়ে দিল।
অমনি কে যেন ওপর থেকে বলে উঠল, “১নং সাক্ষী, নগদ হিসাব, মূল্য চার আনা।চেয়ে দেখলাম কাক্কেশ্বর বসে-বসে হিসেব লিখছে।
শেয়াল আবার জিজ্ঞাসা করল, “তুমি এ বিষয়ে আর কিছু জানো কি-না?”
হিজি বিজ্ বিজ্ খানিক ভেবে বলল, “শেয়ালের বিষয়ে একটা গান আছে, সেইটা জানি।
শেয়াল বলল, “কি গান শুনি?”
হিজি বিজ্ বিজ্ সুর করে বলতে লাগল, “আয়, আয়, আয়, শেয়ালে বেগুন খায়, তারা তেল আর নুন কোথায় পায়—”
বলতেই শেয়াল ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে উঠল, “থাক্-থাক্, সে অন্য শেয়ালের কথা, তোমার সাক্ষী দেওয়া শেষ হয়ে গিয়েছে।
এদিকে হয়েছে কি, সাক্ষীরা পয়সা পাচ্ছে দেখে সাক্ষী দেবার জন্য ভয়ানক হুড়োহুড়ি লেগে গিয়েছে। সবাই মিলে ঠেলাঠেলি করছে, এমন সময় হঠাত্ দেখি কাক্কেশ্বর ঝুপ্ করে গাছ থেকে নেমে এসে সাক্ষীর জায়গায় বসে সাক্ষী দিতে আরম্ভ করেছে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই সে বলতে আরম্ভ করল, “শ্রীশ্রীভূশণ্ডীকাগায় নমঃ। শ্রীকাক্কেশ্বর কুচ্‌কুচে, ৪১নং গেছোবাজার, কাগেয়াপটি। আমরা হিসাবী ও বেহিসাবী খুচরা পাইকারী সকলপ্রকার গণনার কার্য—”
শেয়াল বলল, “বাজে কথা বোলো না, যা জিজ্ঞাসা করছি তার জবাব দাও। কি নাম তোমার?”
কাক বলল, “কি আপদ! তাই তো বলছিলামশ্রীকাক্কেশ্বর কুচ্‌কুচে।
শেয়াল বলল, “নিবাস কোথায়?”
কাক বলল, “বললাম যে কাগেয়াপটি।
শেয়াল বলল, “সে এখান থেকে কতদূর?”
কাক বলল, “তা বলা ভারি শক্ত। ঘণ্টা হিসেবে চার আনা, মাইল হিসাবে দশ পয়সা, নগদ দিলে দুই পয়সা কম। যোগ করলে দশ আনা, বিয়োগ করলে তিন আনা, ভাগ করলে সাত পয়সা, গুণ করলে একুশ টাকা।
শেয়াল বলল, “আর বিদ্যে জাহির করতে হবে না। জিজ্ঞাসা করি, তোমার বাড়ি যাবার পথটা চেন তো?”
কাক বলল, “তা আর চিনি নে? এই তো সামনেই সোজা পথ দেখা যাচ্ছে।
শেয়াল বলল, “এ-পথ কতদূর গিয়েছে?”
কাক বলল, “পথ আবার কোথায় যাবে? যেখানকার পথ সেখানেই আছে। পথ কি আবার এদিক-ওদিক চরে বেড়ায়? না, দার্জিলিঙে হাওয়া খেতে যায়?”
শেয়াল বলল, “তুমি তো ভারি বেয়াদব হে! বলি, সাক্ষী দিতে যে এয়েছ, মোকদ্দমার কথা কি জানো?”
কাক বলল, “খুব যা হোক! এতক্ষণ বসে-বসে হিসেব করল কে? যা কিছু জানতে চাও আমার কাছে পাবে। এই তো প্রথমেই, মান কাকে বলে? মান মানে কচুরি। কচুরি চারপ্রকারহিঙে কচুরি, খাস্তা কচুরি নিমকি আর জিবেগজা! খেলে কি হয়? খেলে শেয়ালদের গলা কুট্‌কুট্ করে, কিন্তু কাগেদের করে না। তার পর একজন সাক্ষী ছিল, নগদ মূল্য চার আনা, সে আসামে থাকত, তার কানের চামড়া নীল হয়ে গেলতাকে বলে কালাজ্বর। তার পর একজন লোক ছিল সে সকলের নামকরণ করতশেয়ালকে বলত তেলচোরা, কুমিরকে বলত অষ্টাবক্র, প্যাঁচাকে বলত বিভীষণ—” বলতেই বিচার সভায় একটা ভয়ানক গোলমাল বেধে গেল। কুমির হঠাৎ খেপে গিয়ে টপ্ করে কোলাব্যাঙকে খেয়ে ফেলল, তাই দেখে ছুঁচোটা কিচ্ কিচ্ কিচ্ কিচ্ করে ভয়ানক চেঁচাতে লাগল, শেয়াল একটা ছাতা দিয়ে হুস্ হুস্ করে কাক্কেশ্বরকে তাড়াতে লাগল।
প্যাঁচা গম্ভীর হয়ে বলল, “সবাই চুপ কর, আমি মোকদ্দমার রায় দেব।এই বলেই কানে-কলম-দেওয়া খরগোশকে হুকুম করল, “যা বলছি লিখে নাও: মানহানির মোকদ্দমা, চব্বিশ নম্বর। ফরিয়াদীসজারু। আসামীদাঁড়াও। আসামী কই?” তখন সবাই বল, “ঐ যা! আসামী তো কেউ নেই।তাড়াতাড়ি ভুলিয়ে-ভালিয়ে নেড়াকে আসামী দাঁড় করানো হল। নেড়াটা বোকা, সে ভাবল আসামীরাও বুঝি পয়সা পাবে, তাই সে কোনো আপত্তি করল না।
হুকুম হলনেড়ার তিনমাস জেল আর সাতদিনের ফাঁসি। আমি সবে ভাবছি এরকম অন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে আপত্তি করা উচিত, এমন সময় ছাগলটা হঠাৎ ব্যা-করণ শিংবলে পিছন থেকে তেড়ে এসে আমায় এক ঢুঁ মারল, তার পরেই আমার কান কামড়ে দিল। অমনি চারদিকে কিরকম সব ঘুলিয়ে যেতে লাগল, ছাগলটার মুখটা ক্রমে বদলিয়ে শেষটায় ঠিক মেজোমামার মতো হয়ে গেল।"




সম্পাদকমণ্ডলী- বেবী সাউ হিন্দোল ভট্টাচার্য মণিশংকর বিশ্বাস সন্দীপন চক্রবর্তী শমীক ঘোষ

যোগাযোগ abahaman.magazine@gmail.com


মেধার চরণ ছুঁয়ে- মণিশংকর বিশ্বাস




বিনয় মজুমদারকে নিয়ে কিছু লেখা আমার পক্ষে সহজ নয়। বস্তুত এ যেন প্রচণ্ড গ্রীষ্মে, মধ্যাহ্নে ছাদের উপর বসে, দাবদাহ  প্রসঙ্গে উত্তুঙ্গ সারগর্ভ একটি রচনা লেখার চেষ্টা করা। আবার অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে, এমতাবস্থায় একটি মরণশীল স্বেদবিন্দুই হতে পারে না-কি সবচাইতে সৎ-সৃজন? অবশ্য তাতেও সমস্যা থেকেই যায়। পাঠকের কাছে  কীভাবে সম্ভব হবে ওই লবনচিহ্নের মর্মোদ্ধার? সাদা কথায় আমি তাঁর জীবনে একটি কণাও নই, কিন্তু বাস্তবিকই বিনয় মজুমদার আমার প্রাণের অংশ, আমার কবিতযাপনের শুরুয়াদতাই বিনয় মজুমদার সম্পর্কে লিখতে বসে সবচেয়ে সৎ লেখাটি তো হওয়া উচিৎ আত্মজৈবনিক। তবু এ-কথা, সে-কথা নয়। শুধু তাঁর মেধার চরণ ছুঁয়ে, স্মৃতিভারাতুর বেদনার নম্র অভিধানখুলে, তাঁরই কবিতা সম্পর্কে এ স্থানে দু’একটি কথা নিবেদন করি।
যদি মানুষের চেতনার সাপেক্ষে এই মহাবিশ্ব কিঞ্চিত ক্যাওটিক হয়ে থাকে, তবে পৃথিবীর এই প্রান্তিক অবস্থানে (আক্ষরিক অর্থেই। শুধু আমাদের আকাশগঙ্গার কেন্দ্র থেকেই পৃথিবীর দূরত্ব ত্রিশ হাজার আলোকবর্ষ) মানব যে এতদিন এত প্রতিকূলতা জয় করে এতকাল টিকে থাকতে পারলো তার একটা কারণ, সামাজিক বিশৃঙ্খলাগুলিকে সামাজিক অনুশাসন দিয়ে সমষ্টির উপযোগী করে তোলা বা তারও আগে মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগত বিশৃঙ্খলাগুলি ছেঁটে, খাটো করে, সর্বজন গ্রাহ্য ও উপযোগী করে, বহুজন সমাজের প্রতিষ্ঠা। এভাবেই গোষ্ঠী, উপজাতি এবং পরিশেষে জাতি, দেশ ইত্যাদির উদ্ভব। বাস্তবিকই এ এক বৃহৎ বিশৃঙ্খলার ভিতর থেকে তাকে নিয়মনিষ্ঠ করে, সামাজিকভাবে পরিবেশন করা। মানে সোজা কথায়, ব্যক্তির জগাখিচুড়িকে সামাজিক খিচুড়ি হিসেবে পরিবেশন করা। আর এতে নীতিশিক্ষার একটা বিশেষ ভূমিকা থেকে গেছে। কী ভাবে বা কার কাছ থেকে শেখে মানুষ? কারণ সত্য তো সত্যই। মানবনিরপেক্ষ। সত্যের কাছে মানুষের শিক্ষণীয় কিছু নেই। মানুষ তাই মিথ্যা আবিষ্কার করেছে। ব্যবহার করেছে একটা কৌশল হিসাবে। সাথে সাথে গড়ে উঠেছে কল্প-কাহিনী-পুরাণ-কিম্বদন্তী। কল্প-কাহিনী-গান-চিত্রকলাকে আঁকড়ে আবার নীতিশিক্ষা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করেছে।  অর্থাৎ মানুষের জীবনে সত্যের অনুপ্রবেশ ঘটেছে নীতিশিক্ষার মাধ্যমে। এবং সামাজিক অর্থে সৎ হয়ে ওঠাকে, মানুষ ভেবেছে সত্যদর্শন। সেটা যে নয়, তাও আমরা আবার জেনেছি শিল্পী-সাহিত্যিকদের কাছ থেকেই। কিন্তু সেই আলোচনা এখানে নয়।
আধুনিক বাংলা কবিতায় বিনয় মজুমদারও সত্যদর্শী শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, সত্যদর্শন করান। মনে রাখতে হবে বিনয় মজুমদার যখন তার পথটি পরিষ্কার করে দেখতে পাচ্ছেন, বা তার নিজের কথায় “আবিষ্কার” করে নিয়েছেন, সে এক উত্তাল সময়। পঞ্চাশের দশকের শেষাশেষি। তাঁর সমসাময়িক বাংলাভাষার আরেক মহত্তম কবি উৎপল বসু যেখানে নীতিশিক্ষাগুলিকেই চ্যালেঞ্জ করেন বা নিজস্ব কাব্যালোক দিয়ে পরখ করেন, বা প্রশ্ন করেন সমাজস্বীকৃত অনৈতিকতাগুলিকেই, কেন তারা অনৈতিক, বিনয় কিন্তু সেটা না করে বরং জাগতিক নিয়মনীতি বা শৃঙ্খলাগুলিকে সূত্রের আকারে প্রকাশ করেন তার কবিতায়। এই ভঙ্গিটিও তার একান্ত নিজস্ব। জীবনানন্দের উপমাগুলি যেমন একবারেই জীবনানন্দীয়, মূলত বর্ণনাত্মক। বিনয় তার দর্শন পরিবেশন করেন অত্যন্ত অভিনব ভাবে, মূলত উপমার আকারে, পর্যবেক্ষণ ও তৎপরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। তিনি বলেওছিলেন একটি লেখায়, “সৃষ্টির মূল যে সূত্রগুলি তা জড়ের মধ্যে প্রকাশিত, মানুষের মধ্যেও প্রকাশিত। এদের ভিতরে সূত্রগুলি পৃথক নয় একই সূত্র তিনের ভিতরে বিদ্যমান।” অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ এবং অনুসিদ্ধান্তের দ্বারা তিনি যেমন দেখাতে চাইলেন সত্যটি এই-ই, রূপকের আশ্রয়ে তেমনি যেন তিনি বলেও দিলেন, মানুষ বা তার জীবনের অনুষঙ্গে এই সত্যটি অবিকল একই। সূত্রটি অনুরূপ। এমন নয় তাঁর এই দেখাগুলি অভিনব। বরং বিনয় সাধারণ দেখাকেও অসামান্য ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন এই বলে যে এই একই সূত্র অন্যত্র, জীবনেও রয়েছে। এইভাবে যেন-বা সত্যের পুনরাবিষ্কার করলেন বিনয়।  এভাবেই তিনি হয়ে যেন হয়ে উঠলেন শ্লোক-প্রণেতা, আধুনিক ধর্ম-ব্যাখ্যাতা। “ফিরে এসো চাকা”এবং “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা”-য় তিনি পঙক্তির পর পঙক্তি কবিতার আড়ালে শ্লোক লিখেছেন, টিকা লিখেছেন, লিখেছেন সূত্র। আক্ষরিক অর্থেই অননুকরণীয় তাঁর এই diction, কবিতায় যার কোন পূর্বাপর নেই। হয় না।
বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে,
যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নিচে
রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ ;”
অতি অল্প পুস্তকেই ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়ে থাকে।”
বর্ণাবলেপনগুলি কাছে গেলে অর্থহীন, অতি স্থূলমনে হয়
অথচ আলেখ্যশ্রেণি কিছুটা দূরত্বহেতু মনোলোভা হয়ে ফুটে ওঠে।”
"পাখিদের থেকে সব পাখি জন্মে, আলোকের থেকে জন্মে সকল আলোক।
এর বিপরীতভাবে, পাখি যদি মরে যায় তবু সেই মৃতদেহ পাখি
গাছ যদি মরে তবে যা থাকে তা— তাও গাছ, মৃত বলে অন্য-কিছু নয়।
সেইভাবে আমাদের মন ম’রে গেলে পরে যা থাকে তা— তাও মন মৃত্যুর নিয়মে।”






২। “বিনয়ের অনেক কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, আমরা বুঝি তেমন এক অন্তিম অবস্থায় পৌঁছে গেছি যেন এরপর আর কোন কবিতা হয় না।”-- উৎপল কুমার বসু
উৎপল কুমার বসু একবার বিনয়ের কবিতা সম্পর্কে ফাইনালিটির কথা বলেছিলেন।  অর্থাৎ যতক্ষণ একটি সত্য বা একটি পর্যবেক্ষণ বিনয়ের কবিতায় লেপ্টে আছে, পাঠক হিসাবে সেখানে প্রায় আত্মসমর্পণ করে বিনয়ের দেখান পথেই সত্যদর্শন করে নিতে হয়। আমি একে ফাইনালিটি না বলে তর্ক-নিরপেক্ষ বা Closed discourse বলতে চাই। বিনয়ের কবিতার পঙক্তির পর পঙক্তি তুলে দেখানো যায়, বিনয়ের কবিতার এই তর্কনিরপেক্ষতা।
শিশুদের আহার্যের মতোন সরল হও তুমি;
সরল, তরল হও; বিকাশের রীতিনীতি এই।”


"সকল ফুলের কাছে এতো মোহময় মনে যাবার পরেও
মানুষেরা কিন্তু মাংসরন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালবাসে।’'
"...এই মহাশূন্য শুধু
স্বতঃস্ফূর্ত জ্যোৎস্নায় পরিপূর্ণ মুগ্ধ হতে পারে।"
“...মাটির গভীরে ইতস্তত
সভ্যতার অবশেষ খুঁজে পাই, পেয়েছি অনেক।”





উপরের এই পঙক্তিগুলি বেছে নেবার কারণ, বিনয়ের কবিতায় পর্বে পর্বে এমন অনেক লক্ষ্যভেদী মহিমান্বিত তীর রয়েছে, যারা যে কোন পরিস্থিতিতে লক্ষ্যভেদে সক্ষম বা তর্কাতীত। কিন্তু কিছু এমন পঙক্তিও রয়েছে, যেমন উপরের এই পঙক্তিগুলি, যেগুলি বিনয়ের কবিতার শরীর থেকে খুলে ফেললে, দেখা যাবে এই পঙক্তিগুলি একই রকমভাবে তর্ক-নিরপেক্ষ (Closed discourse) নয়।
উক্ত উপমাগুলির প্রথমটির ক্ষেত্রে, আমরা জানি সরল, তরল হওয়া সবসময় বিকাশের রীতিনীতি নয়। দ্বিতীয়টি, নির্ভর করছে পাঠকের রুচি ও খাদ্যাভ্যাসের উপর। একজন নিরামিষাশী মানুষ, পঙক্তিটির আক্ষরিক অর্থই উদ্ধার করতে পারবে না। তৃতীয়টি মহাকাশ-বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী তথ্যগত দিক থেকে বিভ্রান্তিকর। চতুর্থটি, উৎপলকুমার বসুর বর্ণিত ফাইনালিটি বা একটি অন্তিম অবস্থা নির্দেশ করে। “বিনয়ের অনেক কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, আমরা বুঝি তেমন এক অন্তিম অবস্থায় পৌঁছে গেছি যেন এরপর আর কোন কবিতা হয় না।” –এই উক্তিটি কিন্তু কোন (গুণবাচক) প্রশংসাবাক্য নয়, বরং বিনয়ের কাব্যশৈলীকে ব্যাখ্যা করতেই বোঝান হয়েছে বলে আমার ধারনা।
এই অতুলনীয় শৈলী, যা একান্ত বিনয়েরই, শেষদিন পর্যন্ত বিনয়ের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রলক্ষণ।
"রাতের বেলায় সব বেশি-বেশি করে বাড়ে, বড় হতে থাকে
আলো খুঁজে পেতে গিয়ে, আলো ভালবাসে বলে সবই কীরকম
তাড়াতাড়ি করে বাড়ে, প্রায় সব ফুলই তাই রাতে ফুটে থাকে।"
"রমণ না করে কোনো রমণী ও পুরুষের বন্ধুত্ব টেকে না,
খুব বেশিদিন ধরে তাদের বন্ধুত্বভাব কখনো টেকে না।"



৩।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ফিরে এসো চাকা এবং পরবর্তীকালেও বিনয় মজুমদারের অনেক সফল কবিতা শুরু হয়েছে একটি অনুসিদ্ধান্তমূলক বিবৃতি থেকে।
মুকুরে প্রতিফলিত সূর্যালোক স্বল্পকাল হাসে।” বা “শিশুকালে শুনেছি কতিপয় পতঙ্গশিকারী ফুল আছে।”
শুধু এই দুটি প্রথম পঙক্তি এখানে একটু পরীক্ষা করে দেখা যাক।
মুকুরে প্রতিফলিত সূর্যালোক স্বল্পকাল হাসে।” অর্থাৎ যেন বলা হচ্ছে, ১। মুকুরের নিজস্ব আলো নেই। ২। প্রতিফলন হয়, তাই সূর্যালোক হাসে। ৩। এই হাসি সূর্যালোক ও মুকুর, উভয়ের যোগাযোগের উপর নির্ভরশীল ৪। এই হাসির স্থায়িত্ব দীর্ঘ নয়।
শিশুকালে শুনেছি কতিপয় পতঙ্গশিকারী ফুল আছে।” ১। শিশুকাল থেকে জ্ঞাত এই জ্ঞান এখনো প্রয়োজনীয়। ২। সব ফুল পতঙ্গশিকারী নয়। ৩। ফুল শুধু কীটপতঙ্গ আকর্ষণ করে না, কখনো কখনো শিকারও করে। ৪। ফুলের সৌন্দর্য কখনো কখনো মারণ-ফাঁদ হয়ে দেখা দেয়।
যেন কবিতাটি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। বস্তুত আমি বিনয় মজুমদারের এই সব কবিতা পড়তে গিয়ে একটি প্রিজমকে দেখতে পাই। যার শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে আছে ভূমি অর্থাৎ কবিতাটির প্রথম লাইন। আর প্রিজমটি যেন একটি উল্টানো পিরামিড। ভূমির দিকটি, ত্রিভুজটি হা করে গিলে নিচ্ছে মহাসূর্যের আলো, মেঘের আবডাল ফুড়ে। যেন সকল আলো, বহুবর্ণ আলো, একীভূত হয়ে প্রিজমটির সরু দিক থেকে নেমে আসছে কবিতাটির শরীরে...যেন প্রিজম নয়, একটি আলোর ফানেল। তো প্রিজমটির এই অদ্ভুত আচরণ মানে উলটো হয়ে থাকা, যেন ভেসে থাকা, মেঘের মত, কিন্তু তার অসহ ভার-বিন্দুটির আবার ছুঁয়ে থাকা কবিতার শরীর...এরকম কেন হয়? এই-ই কী কবির Unbearable Lightness of Being!
“The heavier the burden, the closer our lives come to the earth, the more real and truthful they become. Conversely, the absolute absence of burden cause man to be lighter than air, to soar into heights, take leave of the earth and his earthly being and become only half real, his movements as free as they are insignificant…What then shall we choose? Weight or lightness?” Milan Kundera: The Unbearable Lightness of Being



৪।
“Knowledge is simply the result of the game, confrontation, junction, struggle and compromise between instincts. It's because instincts meet, fight and eventually end up at the end of their battles, to a compromise that something happens. This something is knowledge ".---- Michel Foucault, known and written (1954-1988)
আবহমান কবিতা-বিশ্বের একটি শীর্ষবিন্দু নিশ্চই “ফিরে এসো চাকা”-র ২ নং কবিতাটি। বাংলা কবিতার সবচেয়ে আলোচ্য পঙক্তির একটি হল, এই কবিতার শেষ লাইনটি। ব্যক্তিগত ভাবে আমিও বিশ্বাস করি, পোস্টমর্টেম হয় শুধু মৃতের। তবুএই অবিনশ্বর কবিতাটিকেও আমি বহুবার দেখেছি শল্যচিকিৎসকের টেবিলে শুয়ে থাকতে। আমি শুধু এর শেষ স্ট্যানজাটি আরেকবার পুনঃপাঠ করতে চাই, পাঠককে সামনে রেখে, সাক্ষী রেখে। এবং ধর্মত এই লাইনগুলি কী বলছে সেই বিষয়ে চূড়ান্ত রায়, পাঠক আপনার।  প্রথমে পড়ে দেখা যাক শেষ স্তবকটি।
সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরা কত বেশি বিপদসংকুল
তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ,
এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে
সঞ্চারিত হ’তে চাই, চিরকাল হ’তে অভিলাষী,
সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব’লে |
তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু,
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!”


গোটা স্তবকটিতে তিনটি পর্যবেক্ষণ এবং কবি তা থেকে কী অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সেই কথা বলা আছে। তিনটিই পর্যবেক্ষণ। প্রথম পর্যবেক্ষণটি রয়েছে মাঝখানে, সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে। শুশ্রূষা... মমতা, স্নেহ, ভালবাসা... ভালবাসার ব্যাপকতা... ব্যাপ্তি বা বিস্তার। এই বিস্তার লাভের আকাঙ্ক্ষা যত বাড়ে, ততই বিপদের আশঙ্কা, ততই ভালবাসার স্থানাংকে অবস্থানগত দৌর্বল্য তৈরি হয়। যত তার ব্যাপ্তি, ততই নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়, বা আশঙ্কা রয়েছে বলে কবি মনে করেন। এটা ততটাই স্বাভাবিক, যতটা স্বাভাবিক “মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।” অবশ্য এর অন্য পাঠও সম্ভব। যেমন, সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া ভাল লাগে। স্বাভাবিক। ঠিক সেরকমই স্বাভাবিক, বিপদের আশঙ্কা জেনেও আমরা আরো জাগতিক বিশালতা, মহাজাগতিক বিস্তারের দিকে সঞ্চারিত হতে চাই। অথবা এও হতে পারে, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার দুর্মর বাসনা  বা অজানাকে জানবার চিরজাগরুক স্পৃহাও যেমন একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, অসুস্থ শরীরে ঠিক তেমনি ভাল, গৃহকোণে মমতার স্পর্শ, শুশ্রূষার হাত। তো এটি এক একজন এক একরকম পাঠ করবেন তাই-ই স্বাভাবিক। কিন্তু পাঠককে যেটি হতচকিত করে, তা হল শেষ পঙক্তিটিতে “প্রকৃত” শব্দটির অবিশ্বাস্য ব্যাবহার। আমি এবং অনেকেই ঠিক এই একটি শব্দে এসে মূর্ছা যাইআমি এমনও বলতে শুনেছি, ‘প্রকৃত’ শব্দটি আসলে নাকি ছন্দ ঠিক রাখতেই পয়ারের সমুদ্রে ভেসে এসেছে। কেউ বলেছেন, ‘প্রকৃত সারস’ প্রকৃত প্রস্তাবে কবিতা, শিল্প, সৌন্দর্য, প্রেম, ভালবাসা...ইত্যাদি। আবার কেউ-বা বলেছেন এটি বিশ্ব-সংসারের সেই রহস্য, যা মানুষের অগম্য। এই অমেয়কে স্পর্শ করবার অধিকার, বিধাতা মানুষকে দেয়নি। আমি এর কোনো সম্ভাবনাকেই অসম্ভব ভাবিনি কখনোআবার গ্রহণও করিনি কোন কালেই। কারণ প্রধানত এবং শেষ পর্যন্ত আমি আটকে থাকি একটি সম্ভাবনায়। এবং এর থেকে কখনো পরিত্রাণ পেতেও চাই না। আর সেটি হল, তবে কী ‘অপ্রকৃত’ সারসও হতে পারে?!!! এই অপ্রকৃত সারস কিন্তু ধর্মের তপোবনে ঘুরে বেড়ান অধর্মের জিরাফ নয়, বা ধর্মের শৃঙ্খলার বিপরীতে জিরাফের জেনেটিক ক্যাওস নয়। অথচ বিনয় মজুমদার যে প্রকৃত সারস লিখলেন এর কিন্তু কোন পূর্বসূত্র নেই, তাও নয়। জীবনানন্দ লিখেছিলেন “যেতে যেতে মূল সারসের সাথে হল দেখা।” এমন কিন্তু নয়, “মূল” শব্দটি থেকে “প্রকৃত”শব্দটি অনেক দূরের। কিন্তু বাক্য দুটিতে এদের ব্যাবহার সম্পূর্ণ আলাদা। একটিতে “মূল” সারসের সাথে দেখা হয়, হয়ত তাকে জানা যায়। “মূল” বলতে এখানে প্রধান। তার “সারস”-ত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রকৃত সারস? তাকে কিছুতেই জানা যায় না এবং সেই কারণেই সে প্রকৃত। এই তার অ্যাসিড টেস্ট। এ যেন প্রব্যাবলিটির অঙ্ক কশে দেখান হয়েছে, প্রকৃত সারসের সাথে মানুষের দেখা হবার সম্ভাবনা শূন্য।  কিন্তু যদি অসীমে কোন একটি অক্ষবিন্দুতে গিয়ে তার সাথে দেখাও হয়, তবে সে আর প্রকৃত থাকে না! কী বলে ডাকব তাকে? প্রতি-সারস? অপ্রকৃত জগতের প্রকৃত সারস? ফলত এই সঙ্গে সঙ্গে কবি কী একটি বিকল্প-জগত (Multiverse)-এর কথা বলেন? (ম্যাটার...অ্যান্টিম্যাটার...ডার্ক এনার্জি...?) যেখানে পার্থিব অর্থে অপ্রকৃত সারসের সাথে কবির দেখা হয় কোন এক হেমন্তের বিকেলে, কথা হয়, “এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।”
*************************************************************************************
কথোপকথন- ১
বিনয় মজুমদার আমাকে একবার কথা প্রসঙ্গে, প্রায় স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে, আশেপাশে কেউ নেই— দেখে নিয়ে বলেছিলেন, “ভেবে দ্যাখ, তুমি কোন গোপন জ্ঞানের অধিকারী কি-না। এমন কোন জ্ঞান, এমন কোন কিছু, যা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। তারপরেই বললেন, “এরকম কোন গুপ্ত-জ্ঞান তোমার থাকলে, তবেই লেখ। সেই লেখা লোকের কাজে আসবে।” বোঝাই যাচ্ছে কবিতা যাতে লোকের কাজে আসে, মানুষ, কবির কাছে শিক্ষণীয়কিছু আশা করে, এই রকমই একটি উচ্চ ধারণা কবিতা সম্পর্কে পোষণ করেছেন বিনয় মজুমদার, আজীবন।



কথোপকথন- ২
বিনয়দা, কবিতা আর পদ্যের মধ্যে পার্থক্য কী বলে আপনার মনে হয়?” বিনয়দা কিছুক্ষণ পরে, ডান হাতের তর্জনী উঁচু করে, অমৃতলোক নির্দেশ করে কী এক গূঢ় স্বরে বলেন, “একটি পাখির গান কী-রকম ভাল!” ‘কী’-র দীর্ঘ ঈ-কারটি যারপরনাই দীর্ঘ এবং সঙ্গে অন্তত ৩ টি বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!) ও একটি জিজ্ঞাসা চিহ্ন (?) ইনফিউসড ভাবে উচ্চারিত হয়। তারপর বিনয়দা অস্ফুট স্বরে বলেন, “এই হল কবিতা”। বলাই বাহুল্য আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই পাখির অনুচ্চ গানটিকে, দেখতে পাই তার অলৌকিক মেধাবী-সারল্য। কিন্তু আমার নির্বুদ্ধিতা আমাকে বলে, পদ্যকেও একঝলক চাক্ষুষ দেখে নাও! আমি, গাছের বিশেষত নিচু শাখাগুলিতে তাকে খুঁজি। বিনয়দা চুপ করে থাকেন, কোন কথা বলেন না। আমিও কবিতা বা পদ্য, কাউকে দেখি না আর আশেপাশে।
+++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++
মণিশংকর বিশ্বাস


একঝলকে

ভেঙে যাওয়ার পরে- একটি উপন্যাসের পাঠপ্রতিক্রিয়া- রিমি মুৎসুদ্দি

  ‘মৃত্যুতে শোক থাকে কিন্তু সামাজিক অপযশ থাকে না । ’ ‘ মৃত্যু ’ ‘ শোক ’ ‘ অপযশ ’- একটা গোটা উপন্যাস থেকে এই তিনটে শব্দই কেন...

পছন্দের ক্রম