Thursday, May 30, 2019

বিবস্বান দত্ত-এর কবিতা






মায়ের শরীর খারাপ হলে


*****
সংসারের মেরুদন্ডটা কেঁপে ওঠে
হঠাৎ টানটান চিতল বাঘ যেন গুড়ি মেরে যায়
দুহাত দিয়ে ঘষটাতে ঘষটাতে শরীরটা বয়ে নিয়ে চলা
অতীত সেখানে এক তিরতিরে নদী
আপাতত স্নায়ুহীন

গ্যাসে অপটু ভাতের গন্ধ
ঘরে ঘরে অসুখের জুঁই , আঘ্রাণ
দিনে এতবার ফিনাইল তবু সে লতিয়ে ওঠে ঠিক

মানুষ ক্লান্ত হয়
কেঁপে ওঠে ধৈর্যের শিরা
স্তূপের বাসন যেন বলে যায় নাওয়া খাওয়া বাকি

মায়ের শরীর খারাপ হলে, মনে হয়
আদিগন্ত রোদ যেন একা পড়ে গেছে
বান্ধবী মা হয়ে যায়
খেয়েছো? ওষুধ? কাশিটা কমছে না কেন?
কাল আসছি দাঁড়াও!

আমি দাঁড়িয়ে দেখি , সকাল এসে রান্না করছে
ছানা কাটালো

সামনে মাঠ.. একটা আঁচল উড়ে যাচ্ছে হাওয়া
ওর কোনায় লেগে থাকা ছায়াটুকু নিয়ে জীবন নিবিড় হয়

যতবার দম ছাড়ে ভোর, রোদ এসে আলো জ্বেলে যায়

খুব দ্রুত করে নিতে হবে
রান্না, বাসন, কাপড়
মাকে খাইয়ে মুখে জল, ওষুধ
ওষুধে মাদুলি রাখা আছে

দ্রুত আরো দ্রুত, এর পর ব্লাড নিয়ে যাবে
ল্যাবে রক্ত কাটা ছেঁড়া করে
জানা যাবে, কতটা গভীরে গেছে জুঁইয়ের শিকড়


এবং আবার দ্রুত আসে ওষুধসময়
ঘড়ির কাঁটা যেন দৌড়বাজ ঘোড়া।


আজ সেই দৌড়ে .. কী আশ্চর্য মাগো.. বিষণ্ণ জুঁই গাছ আমায় কেমন
তোমারও মা করে দিল
রান্নায় দিন কাটে , ঘরগুলো যে আমারই তা গোছাতে গিয়েই মনে পড়ে

এদিকে তো পৃথিবী শুয়ে আছেন
তার বুকে জন্ম নিচ্ছে কাঁদনগীত, কথকতা

অন্য কথা উড়ে এল রাতে
উড়ন্ত ডানা যেন কেঁপে ওঠে আগুন ছোঁয়ায়

বান্ধবীর পুরোনো প্রেম, ভাই কিংবা ছেলে
সেইসব পেরিয়ে গিয়ে অন্যকে ভালোবাসা ছেলেটিকে হয়ত বা

হয়ত বা ভালোবেসে ফেলা

এদিকে আবার জল, আবার সমুদ্র হয়ে ওঠে
বারবার ঢেকে দিচ্ছে হা ঈশ্বর জলের প্রলাপ
দম বন্ধ হয়ে মাঝি খড় খুঁজছে খুঁজে চলছে কুটো

এবং আবার হয়ত বা
হয়ত বা
ভেঙে যাচ্ছে নতুন হওয়া প্রেম

প্রতিটি ভাঙনের গানে
আমার কাঁদনগীত শুয়ে থাকা পৃথিবীর বুক মাগো

 কষ্ট হল এক পুরনো বটের চারা
পুরোনো বাড়িকে ভেঙে ভেঙে
যখন তাকে মৃত মনে হয়..
তখনও তখনও .. সে শুধু শিকড় ছড়ায়

ওটির বাইরেটা দমচাপা কলসজঠর
মৃত গর্ভ জেগে উঠবে অসীম প্রজ্ঞায়
একশটি ভ্রূণ জন্ম নেবে এক অমোঘ গদায় পিষ্ট হবে বলে

নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য কী বিপুল জীবনের আয়োজন মাগো
এই অন্ধকার স্মৃতি আমার আললাটলিপি

লাল আলো। শুরু হল অপেক্ষার দিন
জুঁইয়ের চারাটাকে এইবার তুলে ফেলা হবে
আমার অকরুণ পৃথিবী আজ চিন্তায় লীন

জমা পাপরক্ত উঠে যাচ্ছে অনন্ত আকাশ

তুমি জানো মা,
সব ভ্রূণ ঠিক ঠাক পথ চিনে নেয়
পড়ে থাকে ছিন্ন কলস
অথচ দেরি হয়ে যায়
মাধুকরি শেষ করে ফিরে আসি গেহে
অন্নের আয়োজন আমার অপুষ্ট ডানা


আরো তাড়াতাড়ি খুঁজি জীবন তৈজস
সাজিয়ে প্ৰস্তুত করি ঘাম, অপটু চেষ্টা,
ব্যর্থতা।

এত কিছুর পরেও হা ঈশ্বর
পৃথিবীতে ফুল ফোটে না
মায়ের শরীর খারাপ হলে মা বন্ধু হয়ে যায়
আসলে সময়
সহজেই বলে ফেলা যায়
নতুন কোন মেয়ের সাথে উড়ছি

কথাগুলো এমন হালকা হয়েছে.. ফুঁ দিলে পাখির পালক
আমার নতুন প্রেম উড়ে যায় শহরের পথ

অসুখের জুঁই, তারও সাথে বন্ধুতা হয়
রান্নার ছলে ছুঁয়ে রেখে যাওয়া তরল আদর

মা শুয়ে থাকে, মা সব জানে
এইভাবে পৃথিবীরা ধীরে ধীরে বুনে ওঠা স্বর-

ও তোকে ছেড়ে যাবে না তো!
কতদিন সিএল নিয়ে মাতৃসেবা হয়?

যুগের ধর্ম মেনে ছুটে যাও অনন্ত চাকরি

জানালায় জুঁইগাছ বুকে
চেয়ে আছে ত্রস্ত পৃথিবী

No comments:

Post a Comment

একঝলকে

ভেঙে যাওয়ার পরে- একটি উপন্যাসের পাঠপ্রতিক্রিয়া- রিমি মুৎসুদ্দি

  ‘মৃত্যুতে শোক থাকে কিন্তু সামাজিক অপযশ থাকে না । ’ ‘ মৃত্যু ’ ‘ শোক ’ ‘ অপযশ ’- একটা গোটা উপন্যাস থেকে এই তিনটে শব্দই কেন...

পছন্দের ক্রম