Friday, May 31, 2019

ভরা সমুদ্রের প্রেম -- তানিয়া চক্রবর্তী






এই প্রথম তোমার কাছে নয়, আগেও বহুবার কিন্তু তখন কত কাজ, কত কত উদ্বেগ  ! যেন কিছু নিতে এসেছিলাম।তাই আমরা দুজন দুজনকে বুঝতেই পারিনি।আজ আবার এসেছি। প্রেম তো ভাঙেনি  কোনোদিনও, কখনোও---কত কত দিন ধরে তোমার কাছেই আসছি। “আলবেলা সাজন আয়ো রে” --- তুমি সমুদ্র, তুমি সফেন, তুমি নির্ভার। কখনো পাহাড়কেও ভালবেসেছিলাম কিন্তু এখন আমি তোমার কাছে থাকতে চাই সমুদ্র,কারণ আমার আর কোনো ঝাঁকুনি বা ধাক্কা চাইনাএখন আমি আরো আরো শান্ত হতে চাই।পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা শাল গাছ, ইউক্যালিপ্টাসের নেশা, অমসৃণ পথ, নদীর নীলচে হাতছানি, জংলি শরীর সবকিছুতে আমি আমার রহস্য বন্দক রেখে এসেছি । হয়ত আবার প্রেমে পড়তে পারি কোনো পাহাড়েরই কিন্তু জানো সমুদ্র, পাহাড়ে বেশীক্ষণ থাকা যায় না ! এই যেমন তোমাকে কেমন সঙ্কোচ ছাড়াই পাহাড়ের কথা বলে দিলাম , পাহাড়কে কী কখনো বলতে পারতাম তোমার কথা!   

এই ভরা আলোয় তোমার গায়ে সবাই হামলে পড়েছে, তোমাকে কেবল শুষে নিচ্ছে কিন্তু ওরা পারবে না জানো! আমি এসব দেখি, তোমাকে ছেড়ে দিই এই পার্থিব জংলিপনার কাছে। আমি আসব ধরো, এই বিকেল চারটে কিম্বা আরো আরো পড়ে যখন কেউ তোমার গা ঘেঁষে দাঁড়াবে না , আমি আসব, আসতেই থাকব।
জুতো খুলে এসেছি, পায়ে পায়ে তোমার বালুকাময় প্রশ্রয়,তুমিও এগিয়ে আসছো,পায়ে এসে ঠেকল তোমার ঢেউ, এই ছোঁয়া আমার এক পৃথিবী নতুন জন্ম সমুদ্রপায়ের গোছ থেকে আরো সরিয়ে রেখেছি কাপড়, তুমি আসছ, আমি এই তো বসেছি, আমার কোলভর্তি তোমার ঢেউ, তোমার এই নিরন্তর আসা-যাওয়া। চোখ দিয়ে বয়ে যাওয়া সব নোনা জল তুমি নিয়ে যাচ্ছ যেন আমাকে হাসতে হবে আমৃত্যু! তোমার এই ক্ষুদ্র অংশ আমার অচ্ছোদে এতদিন ধরে কত প্রাণ আটকে রেখেছিল তা তুমি জানলে অবাক হবে!আস্তে আস্তে সন্ধ্যে হচ্ছে, মাঝিদের জাল, তোমার গায়ে ভেসে উঠছে নৌকার উল্কি, পাখির ডানা, সূর্যের নাভি---আমি এসে গেছি মাঝসমুদ্রে,এখানে  এত বড় বাগান ---এত স্বর্গ তুমি লুকিয়ে রেখেছ? কখনো বলোনি? এত অহং তোমার? নিজের কথা যদি একটুও না বলো কীভাবে ডুবুব আমি তোমার বুকে!  জানো সমুদ্র, একদিন আমি আমার বাড়ির ছাদে তোমায় দেখেছিলাম , বুঝেছিলাম তোমায় দেখা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই ! এই হাত-পা, শরীরের কোনো ক্রিয়াই নেই তোমাকে দেখা ছাড়া! ঐ পক্ষাঘাতে থাকা মেয়েটার মতোই আমার শুধু একজোড়া আলো আছে যা দিয়ে তোমায় দেখতে পারি আমিকুসুমের মতো চাঁদের আলোয় তোমায় দেখছিলাম আমি, আর দূর থেকে ভেসে আসছিল গোঁসাই এর মানসভ্রমণের ডাক।আমি জানি সমুদ্র তুমি যাবে না আমার সঙ্গে, এখুনি উঠে গেলে এই নোনা জলও উড়ে যাবে।আমায় একটুকরো বাগান দাও সমুদ্র, আমি আমার বারান্দায় তোমায় স্মৃতি করে রাখি! এই এখন যেমন তুমি আমায় কত ভরিয়ে রেখেছ--- আকাশ, পাখি, বুদ্বুদ সব আমার। এত দাও কেন সমুদ্র, এত দিলে আমি বুঝতে পারি আমি কিচ্ছু নয়! আমাকে কিছু না ভাবাতে তোমার এত ভাল লাগে সমুদ্র, বলো?

তোমার মন্থনে অমৃত, রূপকথা, গভীরের রহস্য, আরোহণ-অবরোহণ, গর্জন কিছু চাই না আমার!! শুধু একবার ভেতরে  যেতে চাই; সারারাত , সারারাত তোমার গায়ে পা রেখে তোমায় দেখতে দেখতে মরে যেতে চাই তুমি আমার সব জানার পর ভোররাতে নাহয় মেরেই ফেলো আমায়। তারপর তুমি শান্ত হবে তো সমুদ্র? আমার কাছে রেখে যাও তোমার সংসার, দালান,বাজার , শিশু । একবার শান্ত হয়ো তুমি। তোমার শিশুরা-তোমার বুদ্বুদেরা তোমার গা ঘেঁষে বড় হওয়া লাল- নীল আলো বাজারে জোনাকি কিনছে, কিনছে ফুল, গন্ধ,কানের দুল। বেতের ঝুরি নিয়ে ওরা মিশে যাচ্ছে তোমার মাঝখানে। এইসব আসলে আমি আমার মধ্যে বাঁচিয়ে রাখছি। রাতের কালো বাড়ছে, বাজার উঠে যাচ্ছে ---এই গভীর ঘন সময়ে আমি যাব তোমার কাছে। কারা যেন বলছে বিকেলে তুমি শান্ত ছিলে, রাতে তুমি মাতাল হবে, পাগল হবে! তবু আমি যাব তোমার কাছে ঘন রাতের নিভৃতে। তুমি মাতাল হয়ো, আমায় করো মাতাল --- শুধু পাহাড়ের মতো আচমকা ভেঙে যেও না ,অন্তত এইমুহূর্তে পাষাণ হয়ো না। আমায় তুমি কী দেবে? ফুটফুটে বুদ্বুদদের আলো কেনার সময় দিও। তুমি জল বলে আমি উড়িয়ে দিয়েছি জীবন, অদূরে জ্বলছে চিতা, জীবন হারিয়ে যাচ্ছে এক এক করে, সেই মরা পোরার গন্ধ ভেসে আসছে ঝাউ পাতার ফাঁক দিয়েআলোর গর্জনে তটের গর্তে লাল লাল জীবন, কাঁকড়াদের প্রেম দেখেছো তুমি সমুদ্র ?? এইসব কিছুকে সাক্ষী রেখে বলছি সমুদ্র আমি তোমার কাছে এসে এলিয়ে দেব নিজেকে, তুমি বুঝে নিও। আর কোনোদিন মুছব না এই নোনা জল। এই অলৌকিক রাতের পর সমুদ্র তুমি তটে ফেলে রেখো মুক্ত---কেউ জানবেই না আনন্দে ডুবে আছি তোমার ভেতরে...   

3 comments:

  1. তোমার এমন লেখা তো আগে পরিনি তানিয়া! কী লিখবো বুঝতে পারছিনা। কেবল একটা ঘোরলাগা ভাব, একটা আচ্ছন্ন করা ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়েছে।

    ReplyDelete
  2. গদ্য আপনার হাতে চমৎকার আসে সেটা আরও একবার প্রমাণিত হলো। ধন্যবাদ তানিয়া।

    ReplyDelete

একঝলকে

ভেঙে যাওয়ার পরে- একটি উপন্যাসের পাঠপ্রতিক্রিয়া- রিমি মুৎসুদ্দি

  ‘মৃত্যুতে শোক থাকে কিন্তু সামাজিক অপযশ থাকে না । ’ ‘ মৃত্যু ’ ‘ শোক ’ ‘ অপযশ ’- একটা গোটা উপন্যাস থেকে এই তিনটে শব্দই কেন...

পছন্দের ক্রম